রবিবার, 22 নভেম্বর 2020 23:19

উমর ফারুক নির্বাচিত

লিখেছেন
লেখায় ভোট দিন
(0 টি ভোট)
                তিমির রাত্রি - 'এশা'র আযান শুনি দূর মসজিদে। 
প্রিয়-হারা কার কান্নার মতো এ-বুকে আসিয়ে বিঁধে! 

                     আমির-উল-মুমেনিন, 
তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন। 
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি, 
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী? 
ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান? 
মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্ববান? 

                     আবার লুটায়ে পড়ি। 
'সেদিন গিয়াছে' - শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি। 
উমর! ফারুক! আখেরি নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু! 
আহ্বান নয় - রূপ ধরে এস - গ্রাসে অন্ধতা-রাহু! 
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন! 
সত্যের আলো  নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ। 
শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের 
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের 
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি 
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি! 

ইসলাম - সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি? 
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি। 
আজ বুঝি - কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর- 
'মোরপরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।' 
*  *  *  *  *  *  *  *  *  * 
অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি 
খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি 
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক' নুয়ে, 
ঊর্ধ্বের যারা - পড়ছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে। 
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ 
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ। 
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে, 
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে। 

                     হেরি পশ্চাতে চাহি- 
তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি 
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি 
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি। 
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে- 
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে! 
হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন 
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন 
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো 'খবুজ' রুটি 
একটি  মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু তিন মুঠি। 
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি 
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি! 
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে, 
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে। 
কিছুদূর যেতে উঠ হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, 'ভাই 
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই 
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে, 
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।' 

                     ...ভৃত্য দস্ত চুমি 
কাঁদিয়া কহিল, 'উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি? 
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি 
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?' 

                     খলিফা হাসিয়া বলে, 
'তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে। 
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, 'উমর! ওরে 
করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।' 
কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই। 
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু, মোর অধিকার নাই। 
আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা। 
ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা। 

ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি, 
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী। 
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা, 
কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দী' বিশ্ববীণা। 
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব- 
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, 'জয় জয়  হে মানব।' 
*  *  *  *  *  *  *  *  *  * 
তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক' কারে ভয়, 
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়। 
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান, 
তাই মহাবীর খালদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান, 
সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা, 
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না। 
*  *  *  *  *  *  *  *  *  * 
মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি, 
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা - সেদিন সে বিভাবরী 
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে 
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুদাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে 

কাঁদিতেছে আর দুখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়, 
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকুলে চায়। 
শুনিয়া সকল - কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে 
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে, 
বলিলে, 'এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের 'পরে, 
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে'। 
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা, 
বলিলে, 'বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা! 
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার? 
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার 
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি' - চলিলে নিশীথ রাতে 
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে! 

                     এত যে কোমল প্রাণ, 
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক' অপমান! 
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে 
মেরেছ দোররা, মরেছে পুত্রে তোমার চোখের পরে! 
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি- 
'অপরাধ করে তোরি মতো স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।' 

                     আবু শাহমার গোরে 
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে। 

খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে, 
'কোথায় খলিফা' কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে, 
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে, 
রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে। 
হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট! 
অপমান তব করিব না আজ করিয়া  নান্দী পাঠ, 
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই 
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই। 

(সংক্ষেপিত)            
            
71 বার পড়া হয়েছে
শেয়ার করুন
কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৪, ১৮৯৯ – আগস্ট ২৯, ১৯৭৬) অগ্রণী বাঙালি কবি, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে –- কাজেই "বিদ্রোহী কবি", তাঁর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে উভয় বাংলাতে প্রতি বৎসর উদযাপিত হয়ে থাকে। নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে সম্মানিত মুয়াযযিন হিসেবে কাজও করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা; ধূমকেতুর মত সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী, এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়। মধ্যবয়সে তিনি পিক্‌স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (উৎসঃ উইকিপিডিয়া)

কাজী নজরুল ইসলাম এর সর্বশেষ লেখা

এই বিভাগে আরো: « আশীর্বাদ কবি-রাণী »

মন্তব্য করুন

Make sure you enter all the required information, indicated by an asterisk (*). HTML code is not allowed.